সর্বশেষ

গুলি না ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত পারতো

/ ভোলার সহিংসতায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ /

প্রকাশ :


২৪খবরবিডি: 'ভোলায় বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই নেতাকর্মীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নানামুখী সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশিষ্টজন মনে করছেন, পুলিশ চাইলে গুলি না ছুড়েও ভিন্ন উপায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। একান্তই বাধ্য হলে প্রাণঘাতী নয়, এমন অস্ত্র ব্যবহার করা যেত। তা না করায় পরিস্থিতি 'ঘোলাটে' হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে পুলিশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও কৌশল না থাকাকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ।'

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৩ জুলাই এক সভায় বলেন, বিএনপি তাঁর কার্যালয় ঘেরাও করতে গেলেও বাধা দেওয়া হবে না; বরং নেতাকর্মীদের চা খাওয়ানো হবে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও বলেছেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ করার অধিকার আছে। এসব বার্তায় যখন রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে বলে ধরে নিয়েছিলেন অনেকে, তখনই ৩১ জুলাই ভোলায় সহিংস ঘটনা ঘটল। সেদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূরে আলম বুধবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আর ঘটনার দিনই মারা যান জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আবদুর রহিম। এই পরিস্থিতিতে বিশিষ্টজন পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের কৌশল ঠিক ছিল না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক ২৪খবরবিডিকে বলেন, আমাদের আইন, সংবিধান, সিআরপিসি, পিআরবি- সব জায়গায় পরিস্কার করে বলা হয়েছে যে, সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে গুলি না চালানোর জন্য। হ্যাঁ, তাদের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালাতে পারে। কিন্তু সে রকম পরিস্থিতির উদ্ভব কতটা হয়েছিল, সেটা বোঝার বিষয় ছিল। ফাঁকা গুলি ছোড়া যায়, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা যায়; কিন্তু এটা করে (গুলি চালিয়ে) তারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফেলল। এটা সরকারের জন্য এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটা অন্যরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যারা বিরোধী দলে আছে, তাদের জন্য ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যারা সরকারি দলে আছে তাদের ভাবমূর্তির সংকট হতে পারে। পুলিশ ঠিক কী কারণে গুলি করেছে আমি জানি না, তবে উচিত ছিল, এটা এড়িয়ে চলা। আইনের বিধানই তাই।


-আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটা আসলে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষতার অভাব। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক ২৪খবরবিডিকে বলেন, বড় ধরনের আন্দোলন-জনসমাবেশের ক্ষেত্রে গুলি বা মৃত্যু এড়িয়ে সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের যে প্রস্তুতি, দক্ষতা ও কৌশল দরকার, তা আমাদের পুলিশের নেই। জনগণের মনস্তাত্ত্বিক জায়গা বোঝার জন্য যে প্রশিক্ষণ দরকার, সেটা তাদের দেওয়া হয়নি। উন্নত দেশের পুলিশকে প্রতিটি ইভেন্ট মোকাবিলার জন্য আলাদা কৌশল শেখানো হয়। কিন্তু আমাদের এখনও 'ট্র্যাডিশনাল পুলিশিং' চলছে। এ ছাড়া অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বলীয়ান থাকতে চান। সেই সঙ্গে এটা ব্যবহার করে পরে লাভবান হতে চান। জনরোষের ক্ষেত্রে পুলিশ সংলাপের মাধ্যমে (আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। আর পরিস্থিতি বেশি সহিংস হলে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে; কিন্তু গুলি চালানো ঠিক হয়নি।
 

'অবশ্য সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহীদুল হক কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি ২৪খবরবিডিকে বলেন, পুলিশ সহজে গুলি করে না। গুলি হলো শেষ ধাপ। যখন সব অ্যাকশন ব্যর্থ হয়, যখন জানমালের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন গুলি করে। আত্মরক্ষার্থে তারা গুলি করতে পারে। আর এ ধরনের গুলির ঘটনার নির্বাহী তদন্ত হয়। সেই তদন্তেই বোঝা যাবে সেদিন গুলি করার মতো পরিস্থিতি ছিল কিনা। অবশ্য মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলছেন, সেদিন এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে, পুলিশকে আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়তে হবে। বরং পুলিশ অতি উৎসাহী হয়ে গুলি ছুড়ে জানমালের ক্ষতি করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। নইলে ভবিষ্যতে এটার অপব্যবহার হবে।'


-এদিকে ভোলার সচেতন মহল মনে করে, পুলিশ পেশাদার আচরণ করলে এত হতাহতের ঘটনা ঘটত না। ভোলা জেলা উন্নয়ন ও স্বার্থরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ রায় অপু বলেন, উভয় পক্ষেরই সংযত থাকা উচিত ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, জলকামান ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারত। তাতে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটত না। ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে আগেই গুলির মতো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

'জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ছালাউদ্দিন হাওলাদার বলেন, পুলিশ সেদিন পুরোপুরি পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে গুলি করতে হলে হাঁটুর নিচে গুলি করার বিধান রয়েছে।

গুলি না ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত পারতো 

-সেটার বদলে পুলিশ সরাসরি গুলি শুরু করেছে, যার ফলে এত হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের জেলা সভাপতি মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বলেন, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বাড়াবাড়ির কারণেই ভোলার ঘটনাটি ঘটেছে। আন্দোলনকারীদের চেয়ে পুলিশই এজন্য বেশি দায়ী। মিছিল করা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার। সেখানে পুলিশ কেন বাধা দেবে? পুলিশের উপস্থিত দু-একজনের হঠকারিতাই এ ঘটনার মূল কারণ।'

Share

আরো খবর


সর্বাধিক পঠিত